নীরবে কিডনির ক্ষতি করছে ক্রনিক ডিজিজ, যে লক্ষণগুলো অবহেলা করলেই বিপদ

আমাদের শরীরের ভেতরে দুটি কিডনি দিনের পর দিন কোনো শব্দ ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। রক্ত পরিশোধন থেকে শুরু করে বর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়া সবকিছুই নির্ভর করে এই দুই অঙ্গের ওপর। কিন্তু যখন কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে, তখন শরীরে জমতে শুরু করে ক্ষতিকর উপাদান। এরই পরিণতি হলো ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি)—যাকে চিকিৎসকরা বলেন ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, শুরুতে এই রোগের লক্ষণ অনেক সময়ই চোখে পড়ে না।

কেন ক্রনিক কিডনি ডিজিজ এত ভয়ংকর?

চিকিৎসকদের মতে, কিডনির ফিল্টারিং ক্ষমতা কমে গেলে রক্ত থেকে বর্জ্য ঠিকভাবে বের হতে পারে না। শুধু তাই নয়, কিডনি হরমোন তৈরি, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন এবং হাড়ের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার কাজও করে। এই প্রক্রিয়াগুলো ব্যাহত হলেই শরীরে ধীরে ধীরে জটিল সমস্যা দেখা দেয়।

রোগ বাড়লে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ অগ্রসর হলে সাধারণত যে উপসর্গগুলো প্রকাশ পায়—

স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন ঘন প্রস্রাব
সামান্য কাজেই অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
খাবারে অনীহা বা ক্ষুধামন্দা
হাত-পা বা চোখের পাতা ফোলা
প্রস্রাব ফেনাযুক্ত বা বুদবুদ দেখা যাওয়া
ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া ও চুলকানি
মনোযোগ কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা
বমি ভাব ও পেশিতে টান
রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়া

এই রোগের প্রধান কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রনিক কিডনি ডিজিজের সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো—

ডায়াবেটিস
উচ্চ রক্তচাপ
এ ছাড়া আরও যেসব কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—
গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস
পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ (বংশগত রোগ)
প্রস্রাবের পথে বাধা (পাথর, প্রস্টেট বড় হওয়া বা টিউমার)
দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন
বারবার কিডনি সংক্রমণ

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ পুরোপুরি সারানো সম্ভব না হলেও, সঠিক ব্যবস্থাপনায় কিডনির কার্যক্ষমতা অনেকদিন ধরে ধরে রাখা যায়। ছবি: সংগৃহীত

জটিলতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে?

চিকিৎসা না নিলে এই রোগ থেকে দেখা দিতে পারে—

রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)
হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া
গাউট
হৃদরোগ
স্নায়ুর ক্ষতি
শরীরে অতিরিক্ত পটাশিয়াম ও ফসফরাস জমা
পানি জমে শ্বাসকষ্ট

চিকিৎসা ও জীবনযাপন

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ পুরোপুরি সারানো সম্ভব না হলেও, সঠিক ব্যবস্থাপনায় কিডনির কার্যক্ষমতা অনেকদিন ধরে ধরে রাখা যায়। এজন্য প্রয়োজন

নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপ
ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
কিডনি-বান্ধব খাদ্যাভ্যাস
ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার
নিয়মিত ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা

প্রতিরোধ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি সুস্থ রাখতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা—

বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা
রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা
সুষম খাবার খাওয়া
ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলা
নিয়মিত শরীরচর্চা
অকারণে ব্যথানাশক ওষুধ না খাওয়া

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ একবার শুরু হলে তা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। তবে সময়মতো পরীক্ষা, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন কিডনিকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। নিজের এবং পরিবারের সুস্থতার জন্য আজ থেকেই কিডনির যত্নে মনোযোগী হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক