আল্লাহতায়ালা মানবদেহে হাত, পা, চোখ, কান, নাক, জিহ্বাসহ অনেক মূল্যবান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করেছেন। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি কি তাকে দুটো চোখ, একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট দিইনি? আমি কি তাকে দুটি সুস্পষ্ট পথ দেখাইনি…?’ -সুরা বালাদ : ৮-১০
আমরা চোখ দিয়ে দেখি। কান দিয়ে শুনি। নাক দিয়ে গন্ধ অনুভব করি। পশুর মধ্যেও এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে। কিন্তু মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে পশুর চোখের সামনে যা পড়ে তা দেখে বা শোনে। কিন্তু মানুষের দেখা ও শোনার মধ্যে আল্লাহর পছন্দ বা অপছন্দের সীমারেখার প্রতি খেয়াল রাখা হয়। মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য এখানেই। জিহ্বা দিয়ে আমরা টক-মিষ্টি-ঝাল আস্বাদন করি; কথা বলি। মনের ভাব প্রকাশ করি। কিন্তু শুধু জিহ্বা থাকলেই মানুষ কথা বলতে পারে না। এজন্য বাকশক্তি প্রয়োজন।
আল্লাহতায়ালা মানুষকে কথা বলার জন্য বাকশক্তি দিয়েছেন। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন, যারা কথা বলতে পারেন না; কথা বলার নেয়ামত থেকে বঞ্চিত। আল্লাহতায়ালা বাকশক্তি দেওয়ার পর মানুষকে নেকি ও গোনাহের দুটি পথ দেখিয়ে ইচ্ছামতো বাকশক্তি ব্যবহারের শক্তি দান করেছেন। তাই মানুষ বাকশক্তি প্রয়োগ করে ভালো ও নেকির কথা যেমন বলতে পারে, তেমনি খারাপ, অশ্লীল ও গোনাহের কথাও উচ্চারণ করতে পারে।
আলেমরা বলেন, আল্লাহতায়ালা জিহ্বাকে সিক্ত রেখেছেন সবসময় তার জিকির করার জন্য। কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত করার জন্য। দাওয়াতি কাজ করার জন্য। সঠিক কাজে সঠিকভাবে জবান ব্যবহার করা এবং অশ্লীল, মন্দ ও হারাম থেকে জবানকে হেফাজত করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। মিথ্যা কথা বলা, গিবত করা, অশ্লীল কথা বলা, ঝগড়া করা মস্ত বড় গোনাহ। অনেক মানুষ জিহ্বা ব্যবহার করে এই ধরনের পাপ করছে। তাই আল্লাহতায়ালা জিহ্বা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর রাসুল জিহ্বা ও ভাষা হেফাজতের বাস্তব শিক্ষা দিয়েছেন।
কোরআন মাজিদে লিসান শব্দটি কোথাও জিহ্বা আর কোথাও মুখের ভাষা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন সুরা মায়েদার ৭৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা কাফের, তাদের দাউদ ও মরিয়ম তনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমা লঙ্ঘন করত।’ সুরা ইবরাহিমের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই পাঠিয়েছি। যাতে তাদের পরিষ্কার করে বুঝাতে পারেন।’ সুরা ত্বহার ২৭ নম্বর আয়াতে ‘উকদাতান মিন লিসানি’ দ্বারা জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করার প্রার্থনা করা হয়েছে। সুরা মারইয়ামের ৯৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি কোরআন মাজিদকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর দ্বারা পরহেজগারদের সুসংবাদ দেন এবং কলহকারী সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন।’
প্রকৃত মুসলিমের জবান নিয়ন্ত্রিত থাকে। জিহ্বার কারণে তাদের লজ্জিত হতে হয় না। কেউ তাদের দ্বারা জিহ্বার কারণে কষ্ট পায় না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলে কারিম (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি যার হাত ও জবান থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।’ -সহিহ বোখারি
এই হাদিসে লিসান শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। কালাম শব্দ বলা হয়নি। কারণ অনেক মানুষ আছে মূক তারা কথা বলতে পারে না। কিন্তু মুখের অঙ্গভঙ্গিও অপরকে কষ্ট দিতে পারে। মুখের কথা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ভদ্রতা আর অভদ্রতার পার্থক্য ফুটে ওঠে।
যাদের ভাষা নিকৃষ্ট তারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে পারে না। এই কারণে রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, ‘বান্দার ইমান ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক হবে না, যতক্ষণ না তার অন্তর সঠিক হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত তার অন্তর সঠিক হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার জিহ্বা সঠিক না হবে।’ -মুসনাদে আহমদ
যে ব্যক্তি জবানের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, শয়তান তার দ্বারা অনেক কাজ করায়। যা তার জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ পর্যন্ত হয়ে যায় জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ না রাখার কারণে। এ জন্য রাসুলে কারিম (সা.) রাগের সময় নীরব থাকতে বলেছেন। হজরত সুফিয়ান ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি আরজ করলাম ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার জন্য সবচেয়ে ভয় করার বস্তু কী? তখন রাসুলে কারিম (সা.) স্বয়ং জিহ্বাকে বের করে তা হাত দিয়ে ধরে বলেন এটা। জিহ্বাকে ভয় করার অর্থ সাবধানতা অবলম্বন করা, সচেতনতার সঙ্গে বাক্য প্রয়োগ করা; অনর্থক বাজে কথা না বলা।
এই সচেতনতার কারণ হলো, আমাদের সব কথাবার্তা লিপিবদ্ধ করা হয়। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ রেখো দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যা উচ্চারণ করে তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে। যে লেখার জন্য সদা প্রস্তুত।’ -সুরা কাফ : ১৭-১৮
জিহ্বা একদিকে মানুষের বন্ধু অপরদিকে বড় শত্রু। জিহ্বাকে মানব দেহের বডিগার্ড বলা হয়। কোনো বাড়ির গার্ড যদি অসুস্থ হয়ে যায় যেমনি বাড়ির নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়। তেমনিভাবে কারও জিহ্বা অসংযত হওয়ার রোগে আক্রান্ত হলে সেই ব্যক্তি কাকে কী বলে এই নিরাপত্তাহীনতায় সবাই ভোগে। তাই রাসুলে কারিম (সা.) জিহবা সংযমের নির্দেশ দিয়েছেন।
জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ আখেরাতের নাজাতের পথ। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘সেদিন তাদের বিরুদ্ধে তাদের জিহ্বা হাত ও পা তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষ্য দেবে।’ -সুরা নূর : ২৪
হজরত উকবা বিন আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসুল! আখেরাতে নাজাত পাওয়ার উপায় কী? তিনি জবাব দিলেন, তোমার কথাবার্তা সংযত রাখো, তোমার ঘরকে প্রশস্ত করো (মেহমানদারি করো) এবং তোমার কৃত আমলের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করো। -জামে তিরমিজি
জবানের হেফাজতে মেলে জান্নাতের নিশ্চয়তা। হজরত সাহল ইবন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী বস্তু অর্থাৎ জিহ্বা এবং তার দুই উরুর মধ্যবর্তী তথা লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব।’ -সহিহ বোখারি
Barta Zone 24 – Most Popular Bangla News The Fastest Growing Bangla News Portal Titled Barta Zone 24 Offers To Know Latest National And Local Stories.